ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে জনপ্রিয় এবং মূলধারার রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সুশাসন, সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং নতুন নেতৃত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রকাঠামোতে এমন পরিবর্তন দরকার, যা মানুষ ও প্রকৃতি-পরিবেশ উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে
রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য শুধু নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়; নিরাপত্তার বিষয়টি যখন মাটি-পানি-বায়ু ও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, তখন একটি রাষ্ট্রের আদর্শ হতে হবে পরিবেশবান্ধব। চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যে প্রজন্মের জন্য সম্ভব হয়েছে, তারা যেকোনো প্রজন্ম থেকে পরিবেশ নিয়ে বেশি সচেতন। এদের মধ্যে বড় একটি অংশ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ভোটার। এরা পুরনো গত্বাঁধা নির্বাচনী ইশতেহারের বদলে নতুন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ইশতেহার গ্রহণ করবে, যেখানে নতুন নেতৃত্বে প্রগতিশীল ভাবনা ও পরিবেশ রক্ষা গুরুত্ব পাবে এবং যেখানে মানুষের চাহিদার সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা সমন্বিত থাকবে। এ ক্ষেত্রে ষাট-সত্তরের দশকে আমেরিকার পরিবেশ আন্দোলন কিভাবে রাজনৈতিক এজেন্ডা হয়ে উঠেছিল, সে বিষয়টি অনুপ্রেরণা হতে পারে। আজও আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক মাঠে পরিবেশ রক্ষা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ সংকটাপন্ন হলেও পরিবেশ নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের, রাষ্ট্রের পরিচালকদের নীতিগত অবস্থান দৃঢ় নয়। এ অবস্থায় বেশির ভাগ নদ-নদী, বনাঞ্চল, মাটিসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ধ্বংসের পথে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিমালা ও দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই দায়ী। বাংলাদেশে ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’ শব্দযুগল মন্ত্রে পরিণত হয়েছে পুঁজিবাদের বিস্তার লাভের কারণে। এর জন্য সাময়িকভাবে দেশের বাহ্যিক উন্নয়ন দেখা গেলেও মানবসম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণের উপকরণ হয়ে উঠেছে মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি এবং বড় করপোরেট গ্রুপদের জন্য। এসব কম্পানি-গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রকাঠামোকে ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য।
একটা সময় ছিল, তখন রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের কল্যাণ। এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুঁজি ও ক্ষমতার লড়াই। নির্বাচন হয়ে উঠেছে বাণিজ্য। এ জন্য নির্বাচনের সময় দেখা যায় টাকার খেলা। ব্যবসার টাকা দিয়ে নির্বাচনের প্রচার চলে, ভোটারদের হাতে টাকার খাম ধরিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে নির্বাচিত হয়ে দুর্নীতি করে সেই অর্থ আবার জনগণ ও রাষ্ট্রের সম্পদ থেকে নিয়ে নেয়। তাই আগামী দিনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে জিডিপি বৃদ্ধি না দেখে অতিরিক্ত উৎপাদন ও ভোগের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে সমাজে মূলধারায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। আগামীর পৃথিবীতে এখনকার মতো করে পুঁজিবাদের আধিপত্য খুব বেশিদিন টিকবে না। প্রকৃতি ও পরিবেশে সুস্থতা এলে সমাজেও অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরবে, ক্ষমতার অপব্যবহার কমে আসবে, ভোগের তাগিদ কমবে। কিন্তু এখানে বড় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে বিপুল জনসংখ্যার সমস্যা। যারা ভোটার এবং যাদের কয়েক যুগ ধরে সুনাগরিক কিংবা সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলা হয়নি, রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোতে যাদের শুধু ভোটের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে গতানুগতিক নির্বাচনে নামে মাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করা যায় গণতন্ত্রের সুফল জনগণকে দেওয়া ছাড়াই। এ জন্য অসচেতন জনগোষ্ঠী জানেও না রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই তারাও ব্যবসায়ী রাজনৈতিক নেতাদের মতো সাময়িক নিজের স্বার্থ নিয়েই শুধু ভাবে। এসবের জন্য নির্বাচনে বাড়াবাড়ি রকমের ক্ষমতার শোডাউন, উচ্চ শব্দে মাইকের ব্যবহার দেখা যায়, যা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে উচ্চ শব্দে মাইকের ব্যবহার শিশু ও বয়স্কদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু নির্বাচনী প্রার্থীদের কাছে সাধারণ জনগণের এই কষ্ট-ভোগান্তি বিবেচ্য নয়। রাষ্ট্রের সবার সুবিধা নিশ্চিত করতে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে এর নৈতিক অবস্থান আরো স্পষ্ট করতে হবে। নারীদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংরক্ষিত আসন নারীদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ প্রবেশাধিকার দিলেও পদ্ধতিগতভাবে প্রক্রিয়াটি ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে যেভাবে ব্যবহৃত হয়, তা নারীর সত্যিকারের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে না। বড় রাজনৈতিক দলের উচিত নারীদের বেশি করে মনোনয়ন দেওয়া। রাষ্ট্রকাঠামো এমনভাবে গঠন করতে হবে, যেন একজন নারী কিংবা পুরুষ উভয়েই সুযোগ পায় এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়। তাহলেই নারী-পুরুষের ক্ষমতার বৈষম্য কমবে এবং সমতা আসবে। সর্বোপরি ‘রিফর্ম বাংলাদেশ’ অর্থ শুধু ক্ষমতার পালাবদল না হোক। আসুক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, যাতে বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুষ্ঠু ও মানবিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠে।



নবায়নযোগ্য জ্বালানি এই চাপ কমিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৪.৬৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে আসে। এই পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তি বাতিল করেছে, দুর্নীতির ঝুকি কমাতে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নবায়নযোগ্য প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সৌরবিদ্যুৎ উতপাদনে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১০টি গ্রিড সংযুক্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ভূমির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছে।
জলবায়ু বাজেটে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড এবং ক্লাইমেট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের সহায়তায় প্রায় ১৯৮ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ প্রদান করা হলেও যথাসময়ে তা ছাড় না দেওয়ায় অর্থের সংকট থেকেই যাচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র নবায়নযোগ্য শক্তি এবং গবেষণার জন্য এক বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কখন, কোন খাতে, কিভাবে বরাদ্দ প্রদান করা হবে তা সুনিশ্চিত নয়।
উৎপাদনে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে উন্নয়ন সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, ড্রোনের মাধ্যমে অথবা আইওটির (ইন্টারনেট অব থিংস) সাহায্য নিয়ে ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, মাটি ও আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে বীজ বপনের সঠিক সময় নির্ধারণ, সেচ দেওয়া এবং রোগবালাই শনাক্তকরণে এআই কার্যকর হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে এআই ব্যবহার করে কৃষিতে প্রডাক্টিভিটি বৃদ্ধি করেছে আগের তুলনায়।
সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বাংলাদেশে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদনও, বিশেষ করে ধান, যা আমাদের প্রধান খাদ্য। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ধান উৎপাদক। বাংলাদেশে যে পরিমাণ ধান উৎপন্ন হয় তা দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদা মেটে। অথচ সেই কৃষিই এখন নানা সংকটে জর্জরিত। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তির অপ্রতুল ব্যবহার এবং রাসায়নিকের ওপর অতিনির্ভরশীলতা বাংলাদেশের কৃষিকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি প্রযুক্তি ও রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়েছে মারাত্মক। মাটির উর্বরতা দিন দিন কমছে, জলাশয় দূষিত হচ্ছে এবং মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। বর্তমানে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষিতে নিয়োজিত, যা আগের দশকগুলোর তুলনায় অনেক কম, তবে এখনো এটি বাংলাদেশের একটি প্রধান কর্মসংস্থান খাত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার কারণে জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের কৃষির অবদান মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে কৃষি খাতের অবদান মাত্র ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ।